বৌদ্ধ ধর্মে মাঘী পূর্ণিমার তাৎপর্য ও গুরুত্ব!
-
নিউজ প্রকাশের তারিখ :
Feb 8, 2026 ইং
-
পঠিত: ১৩০ বার
আজ মাঘী পূর্ণিমা! মাঘী পূর্ণিমার শুভেচ্ছা ও সকলের সর্বাঙ্গীন মঙ্গলময় সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।
বৌদ্ধ ধর্মে মাঘী পূর্ণিমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি তিথি। এটি সাধারণত ফেব্রুয়ারি মাসে (বাংলা মাঘ মাসের পূর্ণিমার দিনে) বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য অন্যতম এক ঐতিহাসিক দিন হিসেবে থেরবাদা বৌদ্ধরা পালন করেন, এই দিনটির তাৎপর্য প্রধানত তিনটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঘটনার সাথে যুক্ত:
১. ভগবান বুদ্ধের নির্বাণ ঘোষণা (আনু. ৫৮৩ খ্রিস্টপূর্ব)
• এই দিনে গৌতম বুদ্ধ আনুপদাপ্পসসানায় বুদ্ধ নামে পরিচিত এক অলৌকিক অবস্থায় ধ্যানরত অবস্থায় থাকেন।
• তিনি তার প্রিয় শিষ্য আনন্দকে জানান যে, তিন মাস পরে অর্থাৎ বৈশাখী পূর্ণিমার দিনে তিনি মহাপরিনির্বাণ লাভ করবেন। এই ঘোষণা মাঘী পূর্ণিমার দিনেই দেওয়া হয়।
২. ১২৫০ জন অর্হৎ (রহৎ)-এর স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ ও "ওভাদপাতিমোখ" উপদেশ হিসেবে স্বীকৃত। এষ
• মহামতি বুদ্ধ নির্বাণ ঘোষণার পর, কোনো প্রেরণা বা আহ্বান ছাড়াই ১২৫০ জন অর্হৎ (যারা সবাই বুদ্ধের সরাসরি শিষ্য এবং তিন মাসেরা বর্ষাবাস পরিপালন করে দীর্ঘ পথ পরিভ্রমণ শেষে বুদ্ধের সামনে উপস্থিত হন বজ্জি দেশের রাজধানী বৈশালীর নিকটবর্তী বেণুবনে।
• এই সমাবেশকে অর্হৎগনের স্বেচ্ছাপ্রণোদিত (অলৌকিক) এবং পূর্বনির্ধারিত বলে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে উল্লেখ আছে। এই দিনে তিনটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটে:
• সকল ভিক্ষু কোনো আহ্বান ছাড়াই একই সময়ে উপস্থিত হন।
• সকলেই অর্হৎ (বুদ্ধের চারি আর্য্যসত্য, আর্য অষ্টাঙ্গিক মার্গ, ও প্রতীত্যসমু্ৎপাদ শিক্ষা অনুশীলন এর মাধ্যমে নির্বাণ লাভের শিক্ষা সমাপন করেন।
• সকলেই বুদ্ধের সরাসরি শিষ্য এবং বর্ষাবাস শেষে বুদ্ধের সাক্ষাৎ লাভের জন্য ভ্রমণকারী।
• এই উপলক্ষে বুদ্ধ তাদের "ওভাদপাতিমোখ খুদ্দকনিখায়" নামে একটি প্রসিদ্ধ উপদেশ প্রদান করেন, যা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের জন্য মূলনীতিসমূহ (পাতিমোখ) সমৃদ্ধ করে। এই উপদেশের মূল বক্তব্য তিনটি:
• সকল পাপ থেকে বিরত থাকা
• সকল পুণ্য আচরণে রত হওয়া
• মনকে পূর্ণ শুদ্ধ করা।
৩. প্রথম বৌদ্ধ সঙ্গীতায়নের সমাপ্তি
• বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের তিন মাস পর, প্রথম বৌদ্ধ সঙ্গীতি (সম্মেলন) শুরু হয়, যার সমাপ্তিও এই মাঘী পূর্ণিমার দিনেই সমাপ্তি ঘটে বলে বিশ্বাস করা হয়।
মাঘী পূর্ণিমার আধুনিক তাৎপর্য ও পালনরীতি;
• এই দিনে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিশেষভাবে "পাতিমোখ" (ভিক্ষুদের শৃঙ্খলা বিধি) পাঠ ও আবৃত্তি করেন।
• সাধারণ গৃহস্থ বৌদ্ধরা বিহারে গিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন, ধ্যান, শ্রমণ, দান, সীল-বুদ্ধপূজা ইত্যাদি পুণ্যকর্মে অংশগ্রহণ করেন।
• প্রদীপ প্রজ্বালন, মোমবাতি জ্বালানো এবং বিশেষ প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হয়।
• এটি মহা পুণ্য দিন হিসেবে বিবেচিত, এ দিনে করা সকল পুণ্যকর্ম বৃহত্তর ফলদায়ক হিসেবে পরিগণিত।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য; থাইল্যান্ডের প্রত্যন্ত অঞ্চলে মহান ভিক্ষু সংঘ বর্ষা বাস পালন শেষে ধমকায়া ফাউন্ডেশনের উদ্দেশ্যে যাত্রারম্ভ করে এই মাঘী পূর্ণিমার দিনেই বর্তমান বিশ্বের সর্ববৃহৎ ১ লক্ষ বুদ্ধ প্রতিবিম্বের সর্ববৃহৎ প্যাগোডায় সমবেত হয়ে ভিক্ষু পাতিমোখ্খ পাঠ করে নিজেদের পরিশুদ্ধ করেন। এই অনুষ্ঠানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিষ্ঠিত ২৮৬ টি ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি ও বৌদ্ধ রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগন উপস্থিত হয়ে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের সাথে প্রতি বৎসর মাঘী পূর্ণিমা উদযাপন করে থাকেন। বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদের প্রতিনিধি হিসেবে আমার তত্ত্বাবধানে প্রতিবছরই অনেকেই এই মহান পূণ্যময় দিনে ধম্মকায়া ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছেন যা সকলের জীবনে এক গৌরবের দিন হিসেবে পরিগণিত হবে।
মাঘী পূর্ণিমা বৌদ্ধদের কাছে একটি ত্রি-ঘটনা সংযুক্ত একটি অতি পবিত্র দিন, যেখানে বুদ্ধের নির্বাণ ঘোষণা, স্বতঃস্ফূর্ত অর্হত্গণের সমাবেশ এবং ওভাদপাতিমোখ উপদেশ লাভের স্মৃতি বিজড়িত। এটি বুদ্ধের শিক্ষা ও বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধা ও অনুস্মরণের দিন, এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও নৈতিক জীবনযাপনের প্রেরণা যোগায়।।
সকল প্রকার পাপ থেকে বিরত থেকে, সমাজ, দেশ ও বিশ্বের কল্যাণে সৎ ও কুশল কর্ম সম্পাদন করাই হলো বুদ্ধের শিক্ষা! আজকের এই মাঘী পূর্ণিমার দিনেই ৫৮৩ খ্রীঃ পূর্বে মহামতি বুদ্ধ ত্রিপিটক এর সারসংক্ষপ এক লাইনে বিবৃত করেন।
জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক, দূঃখ থেকে মুক্ত হোক।
লেখক পরিচিতিঃ চিন্ময় বড়ুয়া রিন্টু, চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ বৌদ্ধ যুব পরিষদ-জাতীয় কমিটি।
নিউজটি আপডেট করেছেন : Utfal Barua
কমেন্ট বক্স