ঢাকা | বঙ্গাব্দ

নির্বাচন ও গণতন্ত্র: আস্থার প্রশ্নে বাংলাদেশ লেখক: লায়ন উজ্জল কান্তি বড়ুয়া

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Mar 6, 2026 ইং
  • পঠিত: ৮৯ বার
Overlay/Verification
বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন আজ আর কেবল একটি সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি পরিণত হয়েছে গণতন্ত্র টিকে থাকবে কিনা সেই প্রশ্নের কেন্দ্রবিন্দুতে। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় নির্বাচন মানেই জনগণের মধ্যে উৎকণ্ঠা, অনিশ্চয়তা এবং আস্থাহীনতার এক দীর্ঘ ছায়া। এই বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। এক দশকের বেশি সময় ধরে দেশের নির্বাচন ব্যবস্থা ক্রমেই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে উঠেছে। ভোটার উপস্থিতি কমে যাওয়া, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির সীমিত অংশগ্রহণ, প্রশাসনিক পক্ষপাতের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক- সব মিলিয়ে নির্বাচন আর জনগণের উৎসব নয়, বরং শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গণতন্ত্রের মূল শক্তি যেখানে জনগণের ভোটাধিকার, সেখানে ভোট দেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলা একটি ভয়াবহ সতর্ক সংকেত। বর্তমান বাংলাদেশ অর্থনৈতিক চাপ, মূল্যস্ফীতি, বেকারত্ব এবং সামাজিক বৈষম্যের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এই সংকটকালে জনগণের প্রয়োজন একটি শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও প্রতিনিধিত্বশীল সংসদ। কিন্তু নির্বাচন যদি প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন হয়, যদি জনগণ আগেই ফল নির্ধারিত বলে বিশ্বাস করে, তবে সেই সংসদ যত সাংবিধানিকই হোক না কেন, নৈতিক বৈধতা হারায়। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাজনৈতিক আস্থার চরম ঘাটতি। সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে কার্যকর সংলাপ প্রায় অনুপস্থিত। ক্ষমতার প্রশ্নে একচেটিয়া মনোভাব এবং বিরোধী মত দমনের প্রবণতা গণতান্ত্রিক পরিবেশকে সংকুচিত করছে। রাষ্ট্রযন্ত্র যখন কোনো একটি রাজনৈতিক পক্ষের অনুগত বলে জনমনে প্রতীয়মান হয়, তখন নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হওয়ার সম্ভাবনাই প্রশ্নের মুখে পড়ে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আবার সবচেয়ে বিতর্কিতও। একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হয়েও কমিশন জনআস্থা অর্জনে ব্যর্থ হলে তা গোটা নির্বাচন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা কেবল ঘোষণায় নয়, বরং দৃশ্যমান কর্মকাণ্ডে প্রমাণিত হতে হবে- এটাই বর্তমান সময়ের বড় দাবি। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও জনমনে সংশয় রয়েছে। নির্বাচনকালীন সময়ে এসব প্রতিষ্ঠানের আচরণ যদি প্রশ্নবিদ্ধ হয়, তবে ভোটারদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ সংকুচিত হয়। গণতন্ত্র সেখানে কাগুজে কাঠামোয় সীমাবদ্ধ থেকে যায়। গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজও ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত হলে নির্বাচন নিয়ে মুক্ত আলোচনা বাধাগ্রস্ত হয়, আর সেটি গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের রাজনীতি বিমুখতা ভবিষ্যতের জন্য একটি অশনিসংকেত। জাতীয় সংসদ নির্বাচন ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল হতে পারে না; এটি হতে হবে জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যম। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, অগ্রহণযোগ্য নির্বাচন কোনো সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীলতা বয়ে আনে না; বরং তা রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন। তার জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পারস্পরিক সহনশীলতা, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং একটি শক্তিশালী ও স্বাধীন নির্বাচন কমিশন। এর ব্যর্থতা কেবল একটি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করবে না; বরং তা দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেই অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। প্রশ্ন এখন একটাই, আমরা কি নির্বাচনকে ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবেই রেখে দেব, নাকি একে আবার জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্রের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করব? লেখক পরিচিতি : সেক্রেটারী, লায়ন্স ক্লাব অব চিটাগাং কর্ণফুলী এলিট।

নিউজটি আপডেট করেছেন : Utfal Barua

কমেন্ট বক্স