কর্ণফুলীতে সিএনজি টোকেন বাণিজ্য নিয়ে তোলপাড়, আবছারের প্রতিবাদ

প্রকাশিত: 09:51 সকাল, 16 মে 2026

চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার মইজ্জ্যারটেক এলাকায় সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে টোকেন ও দৈনিক হাজিরার নামে চাঁদাবাজির অভিযোগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় দৈনিক পত্রিকাগুলোতে প্রকাশিত একাধিক প্রতিবেদনে বিএনপি নেতা নুরুল আবছার ও তার ছেলে শাওনের বিরুদ্ধে টোকেন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ ওঠার পর এলাকায় রাজনৈতিক অঙ্গন, পরিবহন খাত এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে তোলপাড় শুরু হয়েছে। তবে এসব অভিযোগকে “ষড়যন্ত্রমূলক ও ভিত্তিহীন” দাবি করে লিখিত প্রতিবাদ জানিয়েছেন নুরুল আবছার।‎‎প্রকাশিত সংবাদে দাবি করা হয়, মইজ্জ্যারটেক এলাকায় অবৈধ সিএনজি অটোরিকশা থেকে মাসিক টোকেন ও দৈনিক হাজিরার নামে কোটি টাকার চাঁদাবাজি চলছে। গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে বলা হয়, প্রতি মাসে প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ টাকা এবং বছরে প্রায় আড়াই কোটি টাকার বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, রাজনৈতিক নেতা, প্রশাসনের কিছু সদস্য এবং বিভিন্ন মহলকে ম্যানেজ করেই এই টোকেন বাণিজ্য পরিচালিত হচ্ছে।‎‎সংবাদে আবছারের ছেলে নজিবুল হক শাওনসহ কয়েকজনের নামও উঠে আসে। তাদের বিরুদ্ধে অতীতে বিভিন্ন অভিযোগ ও মামলার তথ্যও উল্লেখ করা হয়। এছাড়া মইজ্জ্যারটেক এলাকার সাতটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনকে কেন্দ্র করে দক্ষিণ চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের বিভিন্ন উপজেলা থেকে প্রতিদিন হাজার হাজার সিএনজি অটোরিকশা গ্যাস নিতে আসে এবং এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টোকেন বাণিজ্যের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।‎‎প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন রুটভেদে প্রতিটি গাড়ি থেকে মাসিক ২০০ থেকে ৮০০ টাকা পর্যন্ত টোকেন ফি আদায় করা হচ্ছে। পাশাপাশি প্রতিদিন ২০ টাকা করে হাজিরাও নেওয়া হচ্ছে। এতে চালক ও মালিকদের অতিরিক্ত আর্থিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠে।‎‎তবে শনিবার (১৬ মে) এক লিখিত বিবৃতিতে এসব অভিযোগের তীব্র প্রতিবাদ জানান নুরুল আবছার। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক মামলার কারণে প্রায় ১৭ বছর এলাকা ছাড়া ছিলেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর মামলায় জামিন নিয়ে এলাকায় ফেরেন বলে জানান তিনি।‎‎আবছারের দাবি, এলাকায় ফিরে আসার পর একটি কুচক্রী মহল তাকে ও তার ছেলেদের রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন পত্রিকায় মিথ্যা সংবাদ প্রকাশ করাচ্ছে। তিনি বলেন, “আমি দীর্ঘদিন শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম। বিভিন্ন সংগঠনের নির্বাচন পরিচালনা করেছি। আমার বিরুদ্ধে অতীতে বা বর্তমানে কোনো খারাপ রিপোর্ট নেই। প্রকাশিত সংবাদ সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।”‎‎তিনি আরও জানান, ১৯৭৯ সাল থেকে বিভিন্ন শ্রমিক ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা ট্রাক, লরি ও কাভার্ড ভ্যান শ্রমিক ইউনিয়নের সদস্য হিসেবে কাজ করছেন।‎‎সরেজমিনে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মইজ্জ্যারটেক এলাকায় টোকেন বাণিজ্য নতুন কোনো ঘটনা নয়। ১৯৯০ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সিন্ডিকেট পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণও পরিবর্তন হয়েছে।‎‎স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর টোকেন বাণিজ্য অনেকটা বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনের ব্যানারে আবারও তা চালুর চেষ্টা হলেও সাংবাদিক ও প্রশাসনের নজরদারির কারণে সেটি পুরোপুরি সফল হয়নি।‎‎দক্ষিণ জেলা যুবদলের এক নেতা বলেন, “নুরুল আবছার বিএনপির দুঃসময়ের কর্মী। তিনি দীর্ঘদিন শ্রমিক রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। বর্তমানে তাকে রাজনৈতিকভাবে হেয় করার চেষ্টা চলছে।”‎‎সাবেক উপজেলা বিএনপির আরেক নেতা জানান, মইজ্জ্যারটেক এলাকায় পূর্বেও বিভিন্ন সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। শ্রমিকদের বিরোধ মীমাংসা করতে গিয়ে অনেক সময় ব্যক্তি শত্রুতারও সৃষ্টি হয়েছে। তার ভাষায়, “আবছার এলাকায় সম্মানিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত।”‎‎এ বিষয়ে কর্ণফুলী ট্রাফিক পুলিশের ইনচার্জ ইন্সপেক্টর আবু সাঈদ বাকার বলেন, “যাত্রী ও যানবাহনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ট্রাফিক পুলিশ নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর কর্ণফুলীতে সব ধরনের টোকেন বাণিজ্য বন্ধ রয়েছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে যে ট্রাফিক পুলিশকে ম্যানেজ করার কথা বলা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।”‎‎তিনি আরও বলেন, “গত ১ থেকে ৭ তারিখ পর্যন্ত কিছু টোকেন উদ্ধার করা হয়েছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। টোকেন বাণিজ্য বন্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।”‎‎এদিকে স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছে, পরিবহন খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও টোকেন নির্ভর চাঁদাবাজি বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। একইসঙ্গে প্রকৃত তথ্য উদঘাটনে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তারা।