গ্যাস ও কারিগরি ত্রুটি কাটিয়ে ছয় মাস পর সিইউএফএলে সার উৎপাদন শুরু

প্রকাশিত: 07:34 সকাল, 15 সেপ্ট 2026

দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস বন্ধ থাকার পর আবারও উৎপাদনে ফিরেছে রাষ্ট্রায়ত্ত চট্টগ্রাম ইউরিয়া ফার্টিলাইজার লিমিটেড (সিইউএফএল)। গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার পর কারখানা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও বিভিন্ন কারিগরি ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে এতদিন উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হয়নি। শেষ পর্যন্ত ত্রুটি কাটিয়ে মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) সকালে কারখানাটিতে ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু হয়েছে।

দীর্ঘদিন পর উৎপাদন শুরু হওয়ায় সিইউএফএলের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, এবার গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এবং বড় ধরনের কোনো কারিগরি জটিলতা দেখা না দিলে কারখানাটিকে নিয়মিত উৎপাদনের মধ্যে রাখা সম্ভব হবে।

সিইউএফএল সূত্র জানায়, গত মাসের শেষ দিকে কারখানায় গ্যাস সরবরাহ শুরু হয়। এরপর ধাপে ধাপে অ্যামোনিয়া প্ল্যান্ট চালুর কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়। পরে ইউরিয়া প্ল্যান্টের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

তবে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর কারখানার বিভিন্ন ইউনিট চালু করতে গিয়ে কয়েকটি যান্ত্রিক ও কারিগরি জটিলতা দেখা দেয়। ফলে গ্যাস সরবরাহ পাওয়ার পরও তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণাঙ্গ উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হয়নি। কারখানার প্রকৌশলী, কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট কর্মীরা ধারাবাহিকভাবে কাজ করে ত্রুটিগুলো শনাক্ত ও সমাধানের চেষ্টা করেন।

সিইউএফএলের উৎপাদন বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক উত্তম চৌধুরী বলেন, সকালে উৎপাদন প্রাথমিকভাবে শুরু হয়েছে। গত মাসের শেষ দিকে গ্যাস পাওয়া গেলেও কারিগরি ত্রুটির কারণে তাৎক্ষণিকভাবে উৎপাদনে ফেরা সম্ভব হয়নি। এরপর একে একে যন্ত্রপাতিগুলো সচল করার কাজ করা হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, আগামীকালের মধ্যে কারখানাটি পুরোপুরি ত্রুটিমুক্ত হয়ে স্বাভাবিক অবস্থায় আসবে।


সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিজানুর রহমান বলেন, দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস পর কারখানাটি উৎপাদনে ফিরেছে। দীর্ঘ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকায় যে ক্ষতি হয়েছে, নিয়মিত উৎপাদনের মাধ্যমে তা অল্প সময়ের মধ্যে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে তারা আশাবাদী।

কর্ণফুলী নদীর তীরবর্তী আনোয়ারা উপজেলার রাঙ্গাদিয়া এলাকায় কাফকোর পাশে অবস্থিত সিইউএফএল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানা। কৃষি খাতে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

তবে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাসসংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে কারখানাটির উৎপাদন বারবার ব্যাহত হয়ে আসছে। গত আড়াই বছরে এসব কারণে অন্তত ছয় দফা কারখানাটি বন্ধ হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।

কারখানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সিইউএফএলে মাত্র পাঁচ দিন উৎপাদন হয়েছিল। এরপর ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি কারখানাটি বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকার পর একই বছরের অক্টোবরে আবার উৎপাদন শুরু হয়।

এরপর ২০২৫ সালেও গ্যাসসংকট ও যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে বিভিন্ন সময়ে কারখানাটি বন্ধ ও চালুর মধ্য দিয়ে যায়। একবার উৎপাদন শুরু হওয়ার পর কিছুদিন চলার মধ্যেই নতুন করে সমস্যা দেখা দেওয়ায় উৎপাদন ধারাবাহিক রাখা সম্ভব হয়নি।

এতে শুধু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাই ব্যাহত হয়নি, কারখানা বারবার চালু করতে গিয়ে রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনরায় চালুর ব্যয়ও বেড়েছে।

সর্বশেষ ৪ মার্চ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার পর দীর্ঘ প্রায় ছয় মাস পর মঙ্গলবার ১৫ সেপ্টেম্বর আবার উৎপাদনে ফিরল সিইউএফএল।

কারখানা সূত্র জানায়, সিইউএফএল পূর্ণমাত্রায় চালাতে প্রতিদিন প্রায় ৪৮ থেকে ৫২ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস প্রয়োজন। প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ না থাকলে কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে পড়ে।

গ্যাসের চাপ কমে গেলে অথবা সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে উৎপাদন বন্ধ করার পরিস্থিতি তৈরি হয়। ফলে কারখানাটির উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহের ওপর এর কার্যক্রম অনেকটাই নির্ভরশীল।

একসময় সিইউএফএলে দৈনিক প্রায় ১ হাজার ৭০০ টন ইউরিয়া সার উৎপাদনের সক্ষমতা ছিল। কিন্তু পুরোনো যন্ত্রপাতি, দীর্ঘদিন ব্যবহারের কারণে বিভিন্ন ইউনিটের সক্ষমতা কমে যাওয়া, গ্যাসসংকট ও যান্ত্রিক সমস্যাসহ নানা কারণে বর্তমানে কারখানাটির উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৫০০ টনে নেমে এসেছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে শুধু গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; পুরোনো যন্ত্রপাতির নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সংস্কারও জরুরি।

সিইউএফএলের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এবার কারখানাটির উৎপাদন দীর্ঘস্থায়ী হবে বলে আশা করছেন। তাদের মতে, গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত থাকলে এবং বড় ধরনের কোনো কারিগরি ত্রুটি দেখা না দিলে নিয়মিত উৎপাদন ধরে রাখা সম্ভব হবে।

দীর্ঘদিন উৎপাদন বন্ধ থাকায় কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের মধ্যেও এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছিল। উৎপাদন পুনরায় শুরু হওয়ায় সেই পরিস্থিতির কিছুটা অবসান হয়েছে।

দেশের কৃষি খাতে ইউরিয়া সারের চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রায়ত্ত সার কারখানাগুলোর উৎপাদন গুরুত্বপূর্ণ। কোনো বড় সার কারখানা দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকলে স্থানীয় উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি আমদানি ও সার সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়।

এ কারণে সিইউএফএলের মতো গুরুত্বপূর্ণ কারখানাকে বারবার বন্ধ ও চালুর চক্র থেকে বের করে নিয়মিত উৎপাদনে রাখাকে জরুরি মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

এবার প্রায় ছয় মাসের অচলাবস্থা কাটিয়ে উৎপাদন শুরু হলেও সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। গ্যাস সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা, পুরোনো যন্ত্রপাতির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ এবং কারিগরি ত্রুটি দ্রুত সমাধান করা গেলে সিইউএফএল আবারও দেশের সার উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলে আশা করছেন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।