চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা এলাকায় অবস্থিত সেভেন রিংস সিমেন্ট কারখানায় চার পরিবহন শ্রমিককে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়ার প্রতিবাদে নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে শ্রমিক অসন্তোষ। চাকরি পুনর্বহালের দাবিতে শত শত পরিবহন শ্রমিক কর্মবিরতি ঘোষণা করে কারখানার প্রধান ফটকের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছেন। এতে কারখানার পরিবহন কার্যক্রমে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।রোববার (৩১ মে) সন্ধ্যায় আকতার ড্রাইভার, রাকিব ড্রাইভার, শরীফ লিটন ড্রাইভার ও মিজানুর রহমান ড্রাইভারকে চাকরি থেকে অব্যাহতির খবর ছড়িয়ে পড়লে শ্রমিকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। পরে কয়েকশ শ্রমিক কারখানার সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন এবং ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের চাকরিতে পুনর্বহালের দাবি জানান।আন্দোলনরত শ্রমিকরা অভিযোগ করেন, গত কয়েক মাস ধরে বিভিন্ন দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিকদের পরিকল্পিতভাবে টার্গেট করা হচ্ছে। বিশেষ করে শ্রমিকদের পক্ষে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের বাছাই করে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে দাবি তাদের।আন্দোলনরত এক শ্রমিক বলেন, “বিগত আন্দোলনের সময় যারা শ্রমিকদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করেছেন, তাদের একে একে চাকরি থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আজ চারজনকে ছাঁটাই করা হয়েছে। আমরা আশঙ্কা করছি, পরবর্তীতে আরও কয়েকজন শ্রমিককে চাকরিচ্যুত করা হতে পারে। তাই আমরা এর প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছি।”আরেক শ্রমিক বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছি। কিন্তু আমাদের চাকরির নিরাপত্তা নেই, নেই পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা। দাবি তুললেই চাকরি হারানোর ভয় দেখানো হয়। এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”উল্লেখ্য, গত ১ এপ্রিল সেভেন রিংস সিমেন্ট কারখানার প্রায় ২৭০ জন পরিবহন শ্রমিক ‘শোষণ-বঞ্চনার’ অভিযোগ তুলে কারখানার সামনে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন। একই সঙ্গে তারা ৫ দফা দাবিতে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির ঘোষণা দেন।শ্রমিকদের দাবির মধ্যে ছিল নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা, দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ প্রদান, ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করা, ঈদের সরকারি ছুটি প্রদান এবং শ্রমিক হয়রানি বন্ধ করা।সেসময় শ্রমিকরা অভিযোগ করেছিলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানে কাজ করলেও তারা কোনো ধরনের দুর্ঘটনা সহায়তা, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা কল্যাণমূলক সুবিধা পান না। কর্মস্থলে দুর্ঘটনা ঘটলেও মালিকপক্ষ দায়িত্ব এড়িয়ে যায় বলেও অভিযোগ করেন তারা।বর্তমান আন্দোলনকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও তুলেছেন শ্রমিকরা। তাদের দাবি, অতীতে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতার মাধ্যমে শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করা হতো এবং এর বিনিময়ে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হতো। বর্তমানে আন্দোলন দমনে বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষের কিছু নেতাকর্মী সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে বলেও অভিযোগ তাদের।এ বিষয়ে সেভেন রিংস সিমেন্টের ডেপুটি ম্যানেজার সেকান্দার রতন বলেন, “পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কোম্পানির চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ ছিল। কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কয়েকজনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ কারণেই শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন।”তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকদের পূর্বের দাবি-দাওয়া নিয়ে কোম্পানির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিও আলোচনার মাধ্যমে সমাধান হবে বলে আমরা আশাবাদী। খুব শিগগিরই উভয় পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হবে বলে ধারণা করছি।”কোম্পানি সূত্রে জানা গেছে, ঈদুল আজহার ছুটির আগে শ্রমিকদের বেতন ও উৎসব বোনাস পরিশোধ করা হয়েছে। ঈদের ছুটি শেষে কারখানার কার্যক্রম পুরোদমে শুরু হওয়ার আগমুহূর্তে নতুন করে এ শ্রমিক আন্দোলন শুরু হওয়ায় উৎপাদন ও পরিবহন কার্যক্রম নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।কর্ণফুলী থানার উপপরিদর্শক ও শিকলবাহা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, “শ্রমিকদের আন্দোলনের বিষয়টি আমরা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি। সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কর্ণফুলী থানার অফিসার ইনচার্জ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবগত করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে সেজন্য পুলিশ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং উভয় পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে।”এদিকে রাত পর্যন্ত আন্দোলনরত শ্রমিকরা কারখানার সামনে অবস্থান অব্যাহত রাখেন। তাদের ঘোষণা, ছাঁটাইকৃত শ্রমিকদের পুনর্বহাল এবং চাকরির নিরাপত্তা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতি চলবে।
Sarwar Rana