পারস্য উপসাগরে আবারও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের দুই কৌশলগত দ্বীপ গোরুক ও কেশমে বিমান হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান বাহিনী। মার্কিন প্রতিরক্ষা বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড (সেন্টকোম) জানিয়েছে, ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনীর রাডার ও ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে এ হামলা পরিচালনা করা হয়েছে।
সোমবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বার্তায় সেন্টকোম দাবি করে, সম্প্রতি ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের একটি এমকিউ-১ প্রিডেটর ড্রোন ভূপাতিত করেছিল। ওই ঘটনার পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবেই গোরুক ও কেশম দ্বীপে বিমান হামলা চালানো হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর দাবি, অভিযানে ইরানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে অত্যাধুনিক এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম, একটি গ্রাউন্ড কন্ট্রোল স্টেশন এবং দুটি ওয়ান-ওয়ে অ্যাটাক ড্রোন। তবে হামলায় কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালি অঞ্চলে কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে কেশম ও গোরুক দ্বীপ। এ অঞ্চলে ইরানের রাডার ও নজরদারি ব্যবস্থার একটি বড় অংশ পরিচালিত হয় এসব ঘাঁটি থেকে। ফলে মার্কিন হামলা শুধু সামরিক প্রতিক্রিয়া নয়, বরং ইরানের প্রতি একটি শক্ত বার্তাও বহন করছে।
এ হামলার সময়টি বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, দীর্ঘদিনের উত্তেজনার পর সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি স্থায়ী শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের লক্ষ্যে কূটনৈতিক আলোচনা নতুন করে গতি পেয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নতুন সামরিক অভিযান দুই দেশের সম্পর্ককে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।
মূলত ইরানের পরমাণু কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধে জড়িয়ে আছে ওয়াশিংটন ও তেহরান। সেই বিরোধের জের ধরে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে সামরিক অভিযান শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র। প্রায় ৪০ দিনব্যাপী সংঘাতের পর ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও বিভিন্ন সময়ে উত্তেজনাকর ঘটনা ঘটেই চলেছে।
গত সপ্তাহেও হরমুজ প্রণালিতে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, ইরানের প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি মার্কিন পতাকাবাহী তেলবাহী ট্যাংকারকে লক্ষ্য করে ড্রোন হামলার চেষ্টা চালায়। এর জবাবে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসে অবস্থিত একটি ড্রোন উৎক্ষেপণ কেন্দ্রে হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী।
এরপর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কুয়েতে অবস্থিত একটি মার্কিন বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ড্রোন হামলা চালায় বলে অভিযোগ করে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও উভয় পক্ষই নিজেদের অবস্থানকে আত্মরক্ষামূলক বলে দাবি করেছে।
সর্বশেষ গোরুক ও কেশম দ্বীপে মার্কিন বিমান হামলার ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালির মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে আন্তর্জাতিক মহলে।
আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শান্তি আলোচনা চলমান থাকলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সামরিক শক্তি প্রদর্শনের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সম্পর্ক এখনো অত্যন্ত স্পর্শকাতর অবস্থায় রয়েছে। ফলে সামান্য উসকানিও বৃহত্তর সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
এদিকে হামলার বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানানো না হলেও দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও সামরিক সূত্র পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বলে জানা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের এই নতুন উত্তেজনা আগামী দিনগুলোতে কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই নজর রাখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়।
Sarwar Rana