বিদায়ের ঘণ্টা যে বাজবে, তা হয়তো আগে থেকেই টের পেয়েছিলেন আরনে স্লট। গত সপ্তাহে ব্রেন্টফোর্ডের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার পর, যখন লিভারপুলের খেলোয়াড়রা মাঠ জুড়ে মৌসুম শেষের প্রথাগত কায়দায় সমর্থকদের অভিবাদন জানাচ্ছিলেন, তখন এই ডাচ কোচকে অ্যানফিল্ডের ডাগআউটে একা বসে দীর্ঘশ্বাস ফেলতে দেখা গিয়েছিল।
এর ঠিক ছয় দিন পর ক্লাবের পক্ষ থেকে তার বিদায়ের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসে। শনিবার সকালে মার্সিসাইডের ক্লাবটি নিশ্চিত করে, অবিলম্বে লিভারপুলের প্রধান কোচের পদ থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন স্লট।
মূলত এক শান্ত ও গভীর আত্মদর্শনের মুহূর্তেই ৪৭ বছর বয়সী এই ডাচ কোচ বুঝতে পেরেছিলেন যে, অ্যানফিল্ডে তার সময় ফুরিয়ে এসেছে।
লিভারপুলের জন্য বিদায়ী এই মৌসুমটি ছিল ‘কোনোভাবেই মনে রাখার মতো নয়’।
গতবারের চ্যাম্পিয়নদের এবারের প্রিমিয়ার লিগ শিরোপা ধরে রাখার অভিযান ছিল চরম বিপর্যয়কর। পুরো মৌসুমে সব প্রতিযোগিতা মিলিয়ে ২০টি পরাজয় ক্লাবটির গৌরবকে ধূলায় মিশিয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত ৬০ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের পঞ্চম স্থানে থেকে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের টিকিট কাটলেও, চ্যাম্পিয়ন দলের এমন পতন কেউ আশা করেনি। আর এই ব্যর্থতার অন্যতম দায় এসে পড়ে স্লটের কাঁধেই।
বাইরে থেকে ক্লাবের শীর্ষ কর্তারা স্লটের প্রতি সমর্থন দেখালেও, ভেতরে-ভেতরে অ্যানফিল্ডের অশান্ত পরিস্থিতির কারণে তার বিদায়টা অবধারিত হয়ে উঠেছিল। ক্লাব কর্তৃপক্ষ মনে করছে, গ্রীষ্মকালীন দলবদলে স্কোয়াডের বড় ধরনের পুনর্গঠনের আগে এখনই কোচ পরিবর্তন করা দলের জন্য সবচেয়ে ভালো হবে।
শনিবার এক যৌথ বিবৃতিতে লিভারপুলের মালিকপক্ষ জানায়, ‘ক্লাব হিসেবে আমাদের জন্য এটি অত্যন্ত কঠিন একটি সিদ্ধান্ত ছিল। আরনে স্লট লিভারপুল এফসির জন্য যে অবদান রেখেছেন তা ছিল তাৎপর্যপূর্ণ, অর্থবহ এবং সবচেয়ে বড় কথা সাফল্যে ভরা।’
ইতিহাস অবশ্যই স্লটকে লিভারপুলের প্রিমিয়ার লিগ জয়ের মহানায়ক হিসেবে মনে রাখবে। ২০২৪-২৫ মৌসুমে তার অধীনেই লিভারপুল ১০ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে লিগ শিরোপা জিতেছিল। ১৯৯২ সালে প্রিমিয়ার লিগ চালুর পর এটি ছিল লিভারপুলের মাত্র দ্বিতীয় লিগ জয়।
২০২৪ সালের বসন্তে যখন কিংবদন্তি কোচ ইয়ুর্গেন ক্লপ তার ৯ বছরের সোনালী অধ্যায়ের ইতি টানেন, তখন কেউই ভাবেনি তার উত্তরসূরি এসে এই সাফল্য ধরে রাখতে পারবেন। এমনকি সমর্থকদের প্রথম পছন্দ জাবি আলোনসো পর্যন্ত চেলসিতে যোগ দেওয়ার আগে লিভারপুলের কোচ হওয়ার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু ফেইনুর্ডের সাবেক কোচ স্লট এই কঠিন চ্যালেঞ্জ ভয় পাননি।
তার শান্ত ও স্পষ্টভাষী ব্যক্তিত্ব দলের ফুটবলারদের ভীষণ প্রিয় ছিল। বিশেষ করে রায়ান গ্রাভেনবার্কের মতো সাইডবেঞ্চের খেলোয়াড়কে মাঝমাঠের মূল চালিকাশক্তিতে রূপান্তর করার কৃতিত্ব স্লটেরই।
২০২৫ সালের এপ্রিলে যখন টটেনহ্যাম হটস্পারের বিপক্ষে ম্যাচ জিতে লিভারপুল লিগ শিরোপা নিশ্চিত করে, তখন অ্যানফিল্ডে এক অভূতপূর্ব উৎসবের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। ২০২০ সালের লিগ জয়ের আনন্দ কোভিড মহামারির কারণে মাঠে উদযাপন করতে না পারার আক্ষেপ সমর্থকরা স্লটের হাত ধরেই ঘুচিয়েছিলেন।
মাঠের সাফল্যের বাইরেও মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিলেন স্লট। গত জুলাই মাসে এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় ক্লাবের প্রিয় স্ট্রাইকার দিয়োগো জতা এবং তার ভাই আন্দ্রে সিলভার অকাল মৃত্যুর পর যেভাবে তিনি পুরো পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন এবং জতাকে আবেগঘন শ্রদ্ধা জানিয়েছিলেন, তা ফুটবলের চেয়েও বড় কিছু ছিল। স্লট তখন বলেছিলেন, ‘জতা তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সবক্ষেত্রে একজন চ্যাম্পিয়ন ছিল, পরিবারের জন্য, দেশের জন্য এবং আমাদের জন্য।’
তবে আধুনিক ফুটবল সবসময়ই নির্মম। লিভারপুলের আক্রমণাত্মক ফুটবলের ঐতিহ্যের সঙ্গে স্লটের ধীরগতির খেলার শৈলী মিলছিল না। ড্রেসিংরুমের অসন্তোষ এবং সমর্থকদের ক্রমবর্ধমান ক্ষোভের কারণে শেষ পর্যন্ত তার অবস্থান ধরে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
বিদায়টা সুখকর না হলেও, লিভারপুলের ইতিহাসে স্লটের অবদান চিরকাল অমলিন থাকবে। গত সপ্তাহে তার শেষ সংবাদ সম্মেলন শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশে হাসিমুখে স্লট বলেছিলেন, ‘ধন্যবাদ, বন্ধুরা।’ অ্যানফিল্ডের অধ্যায় শেষ হলেও, অল রেডদের সমর্থক ও ইতিহাস তাকে আজীবন কৃতজ্ঞতার সঙ্গেই স্মরণ করবে।
দৈনিক ইনফো বাংলা